মিরপুরে প্রাইমারি শিক্ষার নামে বিধিবহির্ভূত অর্থ আদায় ও অনুমোদনহীন বাণিজ্য
বাংলাদেশ একাত্তর: সংবাদ
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভয়াবহ অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পর্যাপ্ততা ও কার্যকর তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে মিরপুর–পল্লবী এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইমারি স্কুল, যেগুলোর বড় অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত না হয়ে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইন ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত এসব স্কুলের সামনে বড় সাইনবোর্ডে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত’ লেখা থাকলেও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই অনুমোদনের প্রকৃতি, পরিধি ও বৈধতা স্পষ্ট নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ও প্রচলিত শিক্ষানীতির পরিপন্থী।
অভিভাবকদের অভিযোগ অনুযায়ী, কেজি ক্লাসে ভর্তি বাবদ এককালীন ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা সরকারি নির্ধারিত ফি কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর বাইরে রেজিস্ট্রেশন ফি, ফরম ফি, পরীক্ষা ফি, উন্নয়ন ফি, ড্রেস, লোগো, ডায়েরি, টাই, শোল্ডার ব্যাজ, আইডি কার্ড, অভিভাবক কার্ড, কোর্স ফাইল, নেমপ্লেট, পিকনিক ও সার্টিফিকেটসহ নানা খাতে পৃথক পৃথক অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রকাশ্য ফি তালিকা, রসিদ ব্যবস্থাপনা বা স্বচ্ছ হিসাব প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ২৭০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গুরুতর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো অভিভাবক যদি ফি কমানোর আবেদন করেন বা আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানান, তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অসম্মানজনক আচরণ করা হয়, যা নৈতিকতা ও শিক্ষকতার পেশাগত আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিশেষভাবে প্যারাডাইস স্কুলকে ঘিরে অভিযোগের মাত্রা আরও গুরুতর। প্যারাডাইস স্কুলটি রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বর, এ ব্লক, পুরান থানা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। স্থানীয়দের দাবি, একটি মাত্র ভবনেই এই প্রতিষ্ঠানে প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সব স্তরের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই ভবনে একাধিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হলেও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন, অবকাঠামোগত মান, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া ইংলিশ মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন ও বাংলা ভার্সনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী বৈষম্যমূলক ও অনিয়মপূর্ণ বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শিক্ষা কার্যক্রমের মান, শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা, পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো উপেক্ষা করে এসব প্রতিষ্ঠান মূলত অর্থ আদায়কেই প্রাধান্য দিচ্ছে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে একটি শ্রেণি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব স্কুলের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস, প্রশাসন ও তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের অঘোষিত সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে।
ভুক্তভোগী অভিভাবকদের দাবি, মিরপুর–পল্লবী এলাকার সব ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইমারি স্কুলের নিবন্ধন, অনুমোদনের বৈধতা, ফি কাঠামো, শিক্ষক যোগ্যতা, অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রম অবিলম্বে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা আইন, শিক্ষা নীতিমালা ও ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার নামে এই বিধিবহির্ভূত অর্থ আদায় ও বাণিজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


















