পরিবারের দ্বন্দ্ব, লাখ টাকার লোভ নাকি গভীর ষড়যন্ত্র? বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড়, পাল্টা বক্তব্যে উঠছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
রাজু আহমেদ | বাংলাদেশ একাত্তর ডটকম | ৪ আগস্ট, ২০২৫
রাজধানীর মিরপুর দক্ষিণ বিশিলে ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে আপন বড় বোন তাহমিনা আক্তার রানু (৪৫) কে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর (৩৫) বিরুদ্ধে। রবিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে নিজ বাসায় রানুকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ, কিন্তু ঘটনার পর পাল্টা তথ্য সামনে আসায় খুনের রহস্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবুর মালিকানাধীন ইন্টারনেট ব্যবসা থেকে প্রতি মাসে ৪-৫ লাখ টাকা আয় হতো। বাবু ছাত্র হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় পলাতক জীবনযাপন করছিলেন। এ অবস্থায় ব্যবসার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তার বড় বোন রানু। সম্প্রতি লাভের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দুই ভাই-বোনের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা পারিবারিক সমাধানের চেষ্টা করেও মীমাংসা হয়নি।
ভিডিও ফুটেজে বাবুর প্রবেশ, গুলির শব্দে কাঁপলো দক্ষিণ বিশিল
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ তাদের হাতে রয়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, বাবু ও আরও ২-৩ জন ব্যক্তি রাত দেড়টার দিকে রানুর বাসায় ঢুকছেন এবং কিছু সময়ের মধ্যে বের হয়ে যাচ্ছেন। এই সময় আশপাশের লোকজন গুলির শব্দ শুনেছেন বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
মৃত্যুর তথ্য গোপন, হাসপাতালের সন্দেহে ফাঁস সত্য
তাহমিনা আক্তার রানুকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার আত্মীয়-স্বজনরা ডাক্তারদের কাছে দুর্ঘটনার গল্প শোনান। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানায়। এরপরই বেরিয়ে আসে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি।
বাবুকে লক্ষ্য করেই গুলি, বোনের মাথায় লাগে? পাল্টা বক্তব্যে চাঞ্চল্য
ঘটনার পর বাবুর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যে চাঞ্চল্যকর মোড় নেয় তদন্ত। তারা বলছেন, বাবুকে টার্গেট করেই সেদিন বাসায় ঢোকা হয়েছিলো। বাবুর সাথে যারা ছিলো, তাদের মধ্যেই কেউ গুলি চালায়। তবে সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বড় বোন রানুর মাথায় লাগে। বাবুর ঘনিষ্ঠদের দাবি, “রানু কখনোই ব্যবসার হিসাব-নিকাশ করতেন না, পুরো ব্যবসা বাবুই চালাতো। বাবুর রাজনৈতিক শত্রুরাই তাকে ফাঁসাতে বোন হত্যার নাটক সাজিয়েছে।”
তারা আরও বলেন, “বাবুর সাথে যারা ছিলো, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করা দরকার। যারা গুলি চালিয়েছে, তারা কি সন্ত্রাসী না রাজনৈতিক ক্যাডার, সেটিই এখন আসল প্রশ্ন।”
ডিএমপি বলছে—ভিডিও ফুটেজই ফয়সালা করবে সত্য
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, “ভিডিও ফুটেজে বাবুকে স্পষ্টভাবে ভিকটিমের বাসায় ঢুকতে এবং বের হতে দেখা গেছে। তবে ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত চলছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক শত্রুতা নাকি অন্য কোন গভীর ষড়যন্ত্র—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাবুর সাথে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় বের করলেই আসল রহস্য উদঘাটন হবে।”
বাবুর “ফেরারি” পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
বাবুর পলাতক থাকার বিষয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর একাংশ বলছেন, “বাবু কখনোই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে যায়নি। ৫ আগস্টের পরও তাকে এলাকায় স্বাভাবিক চলাফেরা করতে দেখা গেছে।” তারা বলছেন, “যদি সে ফেরারি থাকে, তাহলে কি করে প্রতিদিন এলাকাতে ঘুরে বেড়ায়?”
রাজনৈতিক প্রভাব, পারিবারিক শত্রুতা নাকি টাকার লোভ- সবই সন্দেহের তালিকায়
এখন প্রশ্ন—তাহমিনা আক্তার রানুর মৃত্যু কি পারিবারিক দ্বন্দ্বের বলি? নাকি বাবুকে ফাঁসাতেই পরিকল্পিত খুন? বাবুর রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার শ্বশুরবাড়ির বিএনপি সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তদন্তকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, “এটা শুধু টাকা নয়, এখানে রাজনীতি আর ব্যক্তিগত শত্রুতার জটিল হিসাব রয়েছে।”
চুলচেরা তদন্ত ছাড়া এ ঘটনার সত্য উদঘাটন হবে না—এটাই এলাকাবাসীর দাবি।