বহিষ্কার, পদ শূন্যতা ও স্থগিতাদেশে সাংগঠনিক অনিশ্চয়তা; পদ বাণিজ্য ও বিতর্কিতদের ঠেকাতে কঠোর যাচাইয়ের দাবি
রাজু আহমেদ: সোমবার ৮ জুন ২০২৮
ঢাকা: ঢাকা-১৬ আসনের আওতাধীন পল্লবী ও রূপনগর থানা বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের সংকট নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা ও জল্পনা ক্রমেই বাড়ছে। একের পর এক পদ শূন্য হওয়া, বহিষ্কার এবং সাংগঠনিক পদ স্থগিতের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, পল্লবী থানা বিএনপির আহ্বায়ক বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই নেতৃত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। অন্যদিকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। নিহত সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়ার মৃত্যুর পরও পদটিতে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রূপনগর থানা বিএনপির আহ্বায়কও কামাল বহিষ্কৃত হন। একইসঙ্গে রূপনগর থানা যুবদলের আহ্বায়কের পদ দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা না থাকার অভিযোগে স্থগিত করা হয়। ফলে ঢাকা-১৬ আসনের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই থানায় বিএনপি ও যুবদলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, কবে হবে পল্লবী ও রূপনগর থানা বিএনপি এবং যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি? কারা পাবেন শূন্য পদগুলোর দায়িত্ব? এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। পদপ্রত্যাশীদের অনেককেই বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তদবির, গ্রুপিং কিংবা লবিং নয়, বরং আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, কর্মীবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের মূল্যায়ন করা উচিত। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলা, হামলা ও নির্যাতনের মধ্যেও যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং কর্মীদের পাশে থেকেছেন, তাদেরই নেতৃত্বে আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।”
তবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নতুন কমিটি গঠনকে ঘিরে। তাদের আশঙ্কা, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে সংগঠনকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করে বলেন, অতীতে কিছু ইউনিট ওয়ার্ডের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে মুসলিম বাজার লাল মাঠের কমিটি নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি সাংগঠনিক পদ পেয়েছিলেন।
নেতাকর্মীদের দাবি, আসন্ন যুবদল ও বিএনপির বিভিন্ন ইউনিট, ওয়ার্ড, থানা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগপন্থী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কোনো ব্যক্তি যেন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান না পান, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
তারা আরও বলেন, কোনো প্রভাবশালী মহল, অদৃশ্য ফোনকল কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণের সংস্কৃতি চলতে থাকলে তা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর হবে। পদ বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন করে সামনে এলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে এবং সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, নতুন কমিটি হতে হবে শতভাগ স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতৃত্বের সমন্বয়ে। যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং কর্মীদের পাশে থেকেছেন, তাদেরই মূল্যায়ন করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট হিসেবে পল্লবী ও রূপনগর থানা বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি।
কার্যকর, পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে শুধু স্থানীয় রাজনীতিই নয়, পুরো ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি আরও সুসংহত হবে। তবে বিতর্কিত ব্যক্তি, পদ বাণিজ্য ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া যদি আবারও সামনে আসে, তাহলে তা দলের জন্য নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে বলেও মনে করছেন।
















