শিল্প ও সাহিত্য

বদনা বন্দনা: নিপুল কুমার বিশ্বাস

%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac

  বাংলাদেশ একাত্তর.কম: নিপুল কুমার বিশ্বাস

বদনা গাড়–জাতীয় জল পাত্রবিশেষ নল যুক্ত ঘটি। এর উৎপত্তি ঘটে প্রাচীন বঙ্গে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের আদিবাসিরা শৌচকার্য ও অন্যান্য কয়েকটি কাজে বদনা ব্যবহার করে আসছে। বদনার আকৃতি সাধারনত গোলাকার তবে এর নিচের দিক থেকে সামান্য বাঁকা একটি নালাকার অংশ বেরিয়ে আসে। পানি ভর্তি বদনা কাত করলে এই নল দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। মুলত কম পরিমান পানি, দুধসহ যেকোন তরল স্থানান্তরের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে।

বদনা মুলত মল ত্যাগের পর লজ্জাদেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যবহার হয়। ধর্মীয় আচারেও এর ব্যবহার রয়েছে যেমন মুসলমানদের অযুতে এবং গোসলে বদনা ব্যবহার করে থাকে। সাধারনত কাসা, পিতল, প্লাস্টিক বা এ্যালুমিনিয়ামের হয়ে থাকে। প্রাচীন বঙ্গে মাটির তৈরি বদনার প্রচলন হলেও কাসা, পিতল হয়ে এখন সর্বক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বদনার জয়জয়াকার। বদনা জাপানে ইয়োগি, চিনে চুয়ানজিহি, আরবে ইউইয়া, থাইল্যান্ডে বিউক্স নামে পরিচিত।

একসময় গ্রাম বাংলায় বনে জঙ্গলে প্রকৃতিকার্য সম্পন্ন করার চিরাচরিত নিয়ম ছিল। তাই আগান-বাগানে আর ঝোপ ঝাড়েই ছিল মানুষের ভরসা, আর কর্মসম্পাদনের পর পরিচ্ছন্ন হতে বদনাই ছিল প্রধান অবলম্বন। প্রাচীন বঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ, রাজা গেল, রাজা এলো , সাত কোটি থেকে জনসংখ্যা ষোল কোটি হলো । অনেক কিছু বদলে গেল শুধু বদলাইনি বদনার আকার ও প্রয়োজন। তাইতো একজন রসজ্ঞ বিদগ্ধজন তার এক লেখায় লিখেছেন “ বাঙালি লুঙ্গি ছাড়তে পারে কিন্তু বদনা ছাড়তে পারে না।“ তাইতো হুমায়ুন কবিরের “মেঘনার ঢল“ কবিতায় প্যারোডি করে লিখেছেন-শোন মা আমিনা, বদনা কই, ত্বরা করে মোরে বল,প্রকৃতি ডাক আসিয়াছে, তাই এখনই লাগিবে জল। নদীর কিনারা ঝোপঝাড়ে ভরা, প্রকৃতির ডাকে আছে মোর ত্বরা। কই রে আমিনা, তাড়াতাড়ি, জলদি বদনা আন,কাপড় নষ্ট হইলে কিন্তু ছিঁড়িব তোর দু‘কান।

করোনাকালিন সময়ে বদনা ভারতীয় উপমহাদেশে কত বড় ভুমিকা রেখেছে আমরা একটি বার কি ভেবে দেখেছি। হঠাৎ করেই করোনা ভাইরাস আতঙ্কে নিউইয়ার্কের সব সুপার শপে টয়লেট পেপারের মজুত শেষ হয়ে গেল। করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তাতে টয়লেট রোল নিয়ে মনে হয়েছে এ রকম আতঙ্কে ভুগেছেন অনেক মানুষ। টয়লেট পেপার হয়ে উঠেছে এখন সবচেয়ে আরাদ্য সমাগ্রী গুলোর একটি। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সুপার শপে টয়লেট পেপারের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় একজনকে তিন বক্সের বেশি কিনতে দেওয়া হয়নি। আবার হংকংয়ে একব্যক্তি ৬০০ রোল টয়লেট পেপার চুরির দায়ে সাজা খাটছেন। এছাড়া চীন, জাপান, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ফ্রান্সে করোনায় টয়লেট মজুত করার সংবাদ বের হয়েছে। ভাবতে পারেন সেখানে টয়লেট পেপার নিয়ে কেন এতো টানাটানি। কারন একটায়, তাদের নাই শৌচকার্যে ব্যবহার করার জন্য অতি প্রয়োজনীয় বদনা।

এশিয়া ও আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি বদনা ব্যবহার হয় । বদনা আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা শিখিয়েছে। তাইতো সিলেট সিটি কপোরেশনে টয়লেট দিবসে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা গড়ার লক্ষ্যে বদনা নিয়ে পথে নেমেছিল। বাংলাদেশের কোন কোন জেলার লোকেরা তাদের ব্যাগ-বুচকার সাথে একটা বদনা ছাড়া তাদের পথ চলাই বেমানান মনে করে। শৈশবে বিলে মাছ ধরার সময়ে বদনায় পানি দিয়ে জিয়ল মাছ রেখে পুকুরে ছেড়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা, গ্রামে শৈশব পার করা অনেকেরই আছে। সাম্প্রতিক সময়ে উখিয়া- টেকনাফ সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর দেশী-বিদেশী এনজিওগুলো শরনার্থীদের জন্য টয়লেট নির্মান করে বদনা ফ্রি দেওয়ার উৎসব পালন করেছে।

সংস্কৃত কালজয়ী কাব্য “ মেঘদূতম“ এর অমর রচয়িতা ছিলেন কালিদাস , অথচ তার মতো প্রতিভাধর কবিকেও নাকি তার স্ত্রী ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল অকর্মণ্যের অজুহাতে। গৃহত্যাগ কালে কবি কিছুই নিলেন না , নিজের বদনা আর কম্বল ছাড়া। নগরজীবনে আর পাঁচতারকা হোটেলে আভিজাত্যের কমোডের প্রভাবে বদনা আজ নগর জীবন থেকে হাঁরিয়ে যাওয়ার পথে। অথচ বাঙালী জীবনে বদনা ছিল অপরিহার্য অনুষঙ্গ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় এর অবদান চিরন্তন। আলাউদ্দিনের আচর্য্য প্রদীপের মতো বদনার মধ্য যদি এমন ঐশ্বরিক দত্য শক্তি পাওয়া যেত তাহলে, বর্তমান সমাজের অনিয়মকারি, ঘুষখোর, দূর্নীতিবাজ, কালোবাজারি, মুনাফাখোর, ত্রাণচোর, করোনা ভাইরাসের রির্পোট নিয়ে প্রতারক দেখলেই বাদনা যাদুর প্রদীপের মতো বদনার পরিষ্কারমুখী গুনাবলি দিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে এসব লোকগুলিকে সমাজ থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিত, তাহলে মানুষ হিসেবে আমরা একটা সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র পেতাম।

Print Friendly, PDF & Email
Comments
Share
bangladesh ekattor

bangladesh ekattor

বাংলাদেশ একাত্তর.কম

Reply your comment

Your email address will not be published. Required fields are marked*

1 × 3 =